দ্রুত পেটের গ্যাস কমানোর উপায়: ঘরোয়া ১০টি কার্যকর টিপস
অফিসে মিটিংয়ের মাঝখানে বা বিয়েবাড়িতে পেট ভরে খাওয়ার পরই হঠাৎ পেট ফুলে টাইট হয়ে গেল, সঙ্গে চিনচিনে ব্যথা। এমন অস্বস্তিতে পড়লে মনে হয় এখনই কিছু একটা করা দরকার। ভালো খবর হলো, বেশিরভাগ সময় ঘরোয়া কয়েকটা সহজ উপায়েই দ্রুত আরাম পাওয়া যায়।
পেটে গ্যাস হয় কেন?
আমরা যা খাই, তার একটা অংশ হজম হতে হতে অন্ত্রে গ্যাস তৈরি করে। এটা স্বাভাবিক। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন গ্যাস বেশি তৈরি হয় অথবা বের হতে পারে না। সাধারণ কিছু কারণ:
- খুব তাড়াহুড়ো করে খাওয়া: দ্রুত খেলে খাবারের সঙ্গে অনেক বাতাস পেটে ঢোকে, আর খাবারও ঠিকমতো চিবানো হয় না।
- কোমল পানীয় ও কার্বনেটেড ড্রিংক: এতে থাকা গ্যাস সরাসরি পেটে জমে।
- গ্যাস তৈরি করে এমন খাবার: ডাল, বিন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, পেঁয়াজ, অতিরিক্ত তেল-মসলার খাবার।
- কৃত্রিম মিষ্টি: সরবিটল, জাইলিটল দেওয়া চুইংগাম বা সুগার-ফ্রি খাবার অনেকের হজমে সমস্যা করে।
- চুইংগাম চিবানো, স্ট্র দিয়ে পান করা, খেতে খেতে কথা বলা: এগুলোতেও অজান্তে বাতাস গিলে ফেলা হয়।
- মানসিক চাপ: দুশ্চিন্তার সময় হজমপ্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে, ফলে পেট ফাঁপে।
- দুধ বা দুগ্ধজাত খাবারে সমস্যা: কারও কারও শরীর ল্যাকটোজ ঠিকমতো হজম করতে পারে না।
- কোষ্ঠকাঠিন্য: পেট পরিষ্কার না হলে গ্যাসও আটকে থাকে।
দ্রুত পেটের গ্যাস কমানোর ১০টি ঘরোয়া উপায়
১. হালকা হাঁটাহাঁটি করুন
গ্যাস হলে অনেকে শুয়ে পড়েন, কিন্তু হাঁটা বেশি কাজের। ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধীরে ধীরে হাঁটলে অন্ত্রের নড়াচড়া বাড়ে, আটকে থাকা গ্যাস সহজে বেরিয়ে যেতে পারে। খাওয়ার পর একটু হাঁটার অভ্যাস করলে গ্যাস জমার সমস্যাও কমে।
২. হাঁটু বুকের দিকে টেনে বসুন বা শুয়ে থাকুন
চিত হয়ে শুয়ে দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে এনে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরুন। ৩০ সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর ছেড়ে দিন। এভাবে কয়েকবার করুন। এই অবস্থান পেটে হালকা চাপ দেয় এবং গ্যাস বের হতে সাহায্য করে। যোগব্যায়ামে একে পবনমুক্তাসন বলা হয়।
৩. কুসুম গরম পানি পান করুন
ঠান্ডা পানির বদলে কুসুম গরম পানি ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে খান। গরম পানীয় পেটের পেশি শিথিল করতে সাহায্য করে। একসঙ্গে ঢকঢক করে না খেয়ে অল্প অল্প করে খাবেন, নইলে আবার বাতাস গিলে ফেলবেন।
৪. আদা চা খান
আদা অনেক আগে থেকেই হজমের সমস্যায় ঘরোয়া প্রতিকার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এক টুকরো আদা থেঁতো করে গরম পানিতে ৫ মিনিট ফুটিয়ে ছেঁকে নিন। চিনি কম দিন, চাইলে একটু মধু মেশাতে পারেন। বেশি আদা আবার অনেকের পেটে জ্বালা করে, তাই পরিমাণে সংযম রাখুন।
৫. মৌরি চিবান বা মৌরির পানি খান
আমাদের দেশে খাওয়ার পর মৌরি খাওয়ার চল অনেক পুরোনো। আধা চা-চামচ মৌরি ভালো করে চিবিয়ে খেতে পারেন, অথবা গরম পানিতে ভিজিয়ে সেই পানি পান করতে পারেন। হজমে আরাম পেতে এটা অনেকেই ব্যবহার করেন।
৬. পুদিনা পাতার চা
পুদিনা পাতা গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে চা বানিয়ে খেতে পারেন। এটা পেট ফাঁপা ও অস্বস্তিতে আরামদায়ক মনে হয় অনেকের কাছে। তবে যাদের বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে পুদিনা অনেক সময় জ্বালা বাড়াতে পারে, তাই নিজের শরীর বুঝে খাবেন।
৭. পেটে হালকা ম্যাসাজ করুন
হাতের তালু পেটের ওপর রেখে নাভির চারপাশে ঘড়ির কাঁটার দিকে আলতো করে ঘোরান। জোরে চাপ দেবেন না। ৫ থেকে ১০ মিনিট ম্যাসাজ করলে অন্ত্রের নড়াচড়া উদ্দীপিত হয়, কোষ্ঠকাঠিন্যজনিত গ্যাসে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।
৮. পেটে গরম সেঁক দিন
গরম পানির ব্যাগ বা কাপড়ে মোড়ানো গরম সেঁক পেটের ওপর ১৫ মিনিট রাখুন। এতে পেটের পেশি আলগা হয় এবং ব্যথা কমে। খেয়াল রাখবেন, সেঁক যেন সহনীয় গরম হয়, ত্বক পুড়ে না যায়।
৯. ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন
মানসিক চাপের কারণে গ্যাস হলে গভীর শ্বাসের অনুশীলন কাজে আসে। নাক দিয়ে ধীরে শ্বাস নিন, কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর মুখ দিয়ে ধীরে ছাড়ুন। এভাবে কয়েকবার করলে শরীর শান্ত হয় এবং হজমও সহজ হয়।
১০. দরকার হলে ফার্মেসির ওষুধ, তবে পরামর্শ নিয়ে
অনেক সময় সিমেথিকোন জাতীয় গ্যাস কমানোর ওষুধ পেটের গ্যাসের বুদবুদ ভেঙে দিয়ে আরাম দেয়। কিন্তু কোন ওষুধ আপনার জন্য নিরাপদ, তা নির্ভর করে আপনার বয়স, অন্য রোগ এবং চলমান ওষুধের ওপর। তাই ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ওষুধ শুরু করবেন না।
গ্যাস হলে কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?
- কোমল পানীয়, সোডা ও কার্বনেটেড ড্রিংক
- অতিরিক্ত তেলে ভাজা ও ঝাল-মসলাদার খাবার
- ডাল, বিন, রাজমা, ছোলা (বেশি পরিমাণে)
- ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি
- সরবিটল বা জাইলিটল দেওয়া সুগার-ফ্রি খাবার ও চুইংগাম
- দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, যদি আপনার শরীরে সহ্য না হয়
গ্যাসের সমস্যায় কী খাবেন?
হালকা ও সহজে হজম হয় এমন খাবার বেছে নিন। যেমন সেদ্ধ বা রান্না করা সবজি, ভাত, কলা, পাকা পেঁপে, টক দই (যদি সহ্য হয়), স্যুপ ও কুসুম গরম পানি। কাঁচা সালাদ বা ভারী খাবার তখন কিছুদিন এড়িয়ে চললে পেট আরাম পায়।
গ্যাস যাতে বারবার না হয়, সেজন্য প্রতিদিনের অভ্যাস
- ধীরে খান: খাবার শেষ করতে অন্তত ২০ মিনিট সময় নিন এবং ভালো করে চিবান।
- খাওয়ার সময় কথা কম বলুন এবং স্ট্র ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
- একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে খান।
- ডাল বা বিন রান্নার আগে ভালো করে ভিজিয়ে রাখুন, তাতে অনেকের পেটে কম গ্যাস হয়।
- নিয়মিত পানি পান করুন এবং ফাইবারযুক্ত খাবার ধীরে ধীরে বাড়ান।
- খাওয়ার পর অন্তত ১০ মিনিট হাঁটুন, সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়বেন না।
- মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে হালকা ব্যায়াম বা মেডিটেশন করুন।
কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি?
সাধারণ গ্যাস নিজে থেকেই কমে যায়। তবে নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি থাকলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান:
- পেটে অসহ্য বা ক্রমাগত বাড়তে থাকা ব্যথা
- মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া বা মল কালো হয়ে যাওয়া
- বারবার বমি বা বমির সঙ্গে রক্ত
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
- জ্বরের সঙ্গে পেট ফোলা
- বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট (এটা গ্যাসের ব্যথা ভেবে অবহেলা করবেন না)
- কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস বা পেট ফাঁপা লেগেই থাকা
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
পেটে গ্যাস হলে সবচেয়ে দ্রুত কী করা উচিত?
সবচেয়ে দ্রুত আরামের জন্য হালকা হাঁটুন, কুসুম গরম পানি বা আদা চা পান করুন এবং হাঁটু বুকের দিকে টেনে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন। পেটে হালকা ম্যাসাজ বা গরম সেঁকও কাজে আসে।
গ্যাস হলে কী খাওয়া উচিত নয়?
কোমল পানীয়, তেলে ভাজা খাবার, অতিরিক্ত ডাল-বিন, ফুলকপি-বাঁধাকপি এবং কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
গ্যাসের ব্যথা আর বুকের ব্যথা কীভাবে আলাদা করব?
দুটোকে আলাদা করা সবসময় সহজ নয়। বুকে চাপ, ভারী ভাব, বাম হাতে বা চোয়ালে ব্যথা ছড়ানো, ঘাম বা শ্বাসকষ্ট থাকলে এটাকে গ্যাস ভেবে বসে না থেকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের কাছে যান।
রোজ গ্যাস হলে কি কোনো বড় রোগের লক্ষণ?
সবসময় নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খাওয়ার অভ্যাস, মানসিক চাপ বা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণেই হয়। তবে নিয়মিত গ্যাসের সঙ্গে ওজন কমা, রক্তপাত বা তীব্র ব্যথা থাকলে পরীক্ষা করানো জরুরি।
গ্যাসের জন্য কি রোজ ওষুধ খাওয়া ঠিক?
না। দীর্ঘদিন নিজে নিজে ওষুধ খেলে আসল কারণ চাপা পড়ে যেতে পারে। সমস্যা বারবার হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
শেষ কথা
পেটের গ্যাস অস্বস্তিকর হলেও বেশিরভাগ সময় সহজ কিছু অভ্যাস আর ঘরোয়া উপায়ে নিয়ন্ত্রণে আসে। ধীরে খাওয়া, হাঁটা আর খাবার বেছে নেওয়ার অভ্যাস করলে গ্যাসের সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। তবে উপসর্গ বেশি দিন থাকলে বা বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দ্রষ্টব্য: এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।


