সেকেন্ড-হ্যান্ড আইফোন কিনছেন? ঠকার আগে এ টু জেড চেক করার সম্পূর্ণ গাইডলাইন

অনেকেরই স্বপ্ন থাকে একটি প্রিমিয়াম ফ্ল্যাগশিপ ফোন ব্যবহার করার। কিন্তু নতুন আইফোনের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় সেকেন্ড-হ্যান্ড বা ব্যবহৃত আইফোন কেনাটাই এখন সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন অনেকে। শোরুমের দামের চেয়ে বেশ কিছুটা কম দামে ভালো কন্ডিশনের একটি আইফোন হাতে পেলে কার না ভালো লাগে! কিন্তু এখানেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

বাইরে থেকে দেখতে একদম নতুনের মতো চকচকে হলেও, ভেতরের যন্ত্রাংশে বা সফটওয়্যারে থাকতে পারে বড় ধরনের সমস্যা। একটু অসতর্ক হলেই আপনার কষ্টের জমানো টাকা পুরোপুরি জলে যেতে পারে। তাই, সেকেন্ড-হ্যান্ড আইফোন কেনার আগে ঠিক কী কী বিষয় খুঁটিয়ে দেখতে হবে, তা জানা থাকাটা আপনার জন্য ফরয বলা চলে। চলুন, যেকোনো মডেলের ব্যবহৃত আইফোন কীভাবে ভালোভাবে চেক করে নিতে হয়, তার পুরো নিয়মকানুন জেনে নেওয়া যাক।

১. বাহ্যিক অবস্থা বা ফিজিক্যাল কন্ডিশন যাচাই

ফোনটা হাতে নেওয়ার পর প্রথমেই এর চারপাশটা ভালো করে খেয়াল করুন। বডিতে বা ডিসপ্লেতে কোনো বড় স্ক্র্যাচ বা ডেন্ট (আঘাতের দাগ) আছে কি না তা দেখুন। যদি ফোনের কোণায় বড় কোনো ডেন্ট থাকে, তবে বুঝতে হবে ফোনটি আগে হাত থেকে শক্ত কোথাও পড়েছিল, যার কারণে ভেতরের মাদারবোর্ডেও সমস্যা থাকতে পারে। এরপর ভলিউম বাটন, পাওয়ার বাটন এবং বিশেষ করে সাইলেন্ট সুইচটি (Mute Switch) কয়েকবার অন-অফ করে দেখুন ঠিকমতো কাজ করছে কি না। চার্জিং পোর্টের ভেতরে টর্চ মেরে দেখুন সেখানে অতিরিক্ত ময়লা বা জং ধরে আছে কি না।

২. আইক্লাউড লক (iCloud Activation Lock) চেক

সেকেন্ড-হ্যান্ড আইফোন কেনার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে ভয়ংকর একটি ফাঁদ। ফোন কেনার আগে অবশ্যই Settings-এ গিয়ে একদম ওপরে দেখবেন আগের মালিকের Apple ID সাইন-ইন করা আছে কি না। যদি থাকে, তবে তাকে বলবেন তার পাসওয়ার্ড দিয়ে আইডিটি সাইন-আউট করে দিতে। এরপর Settings > General > Transfer or Reset iPhone-এ গিয়ে 'Erase All Content and Settings' করে ফোনটি সম্পূর্ণ রিসেট করে নিজের অ্যাপল আইডি দিয়ে অ্যাক্টিভ করবেন। যদি বিক্রেতা ফোন রিসেট করতে না দেয়, তবে সেই ফোন ভুলেও কিনবেন না। এটি চুরি করা ফোন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

৩. ডিসপ্লে এবং ট্রু-টোন (True Tone) চেক করা

আইফোনের ডিসপ্লে নষ্ট হলে তা পরিবর্তন করতে অনেক টাকা খরচ হয়। তাই অনেকেই কম দামি কপি ডিসপ্লে লাগিয়ে বিক্রি করে দেন। অরিজিনাল ডিসপ্লে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো 'True Tone' অপশন চেক করা। স্ক্রিনের ওপর থেকে ডান দিকে সোয়াইপ করে কন্ট্রোল সেন্টার নামান। এরপর ব্রাইটনেস স্লাইডারে চেপে ধরুন। সেখানে যদি 'True Tone' অপশনটি থাকে এবং অন-অফ করলে স্ক্রিনের রঙের (উষ্ণতা) পরিবর্তন হয়, তবে বুঝবেন ডিসপ্লে অরিজিনাল। তবে মনে রাখবেন, আজকাল অনেক কপি ডিসপ্লেতেও ট্রু-টোন কপি করে দেওয়া যায়। তাই স্ক্রিনের কালার খুব বেশি নীলাভ বা ফ্যাকাসে লাগছে কি না, তা নিজের চোখ দিয়েও যাচাই করবেন।

৪. ব্যাটারি হেলথ (Battery Health) এবং বুস্টেড ব্যাটারি

আইফোন ব্যবহারকারীদের সবচেয়ে বড় চিন্তার নাম ব্যাটারি। Settings > Battery > Battery Health & Charging-এ গিয়ে 'Maximum Capacity' চেক করুন। সাধারণত ৮৫% এর ওপরে থাকলে ব্যাটারি কন্ডিশন ভালো বলে ধরা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক অসাধু বিক্রেতা থার্ড-পার্টি সফটওয়্যার দিয়ে ব্যাটারি হেলথ বাড়িয়ে বা 'বুস্ট' (Boost) করে রাখে।

বুস্টেড ব্যাটারি কীভাবে ধরবেন? ফোনটি হাতে নিয়ে একটানা ১০-১৫ মিনিট হাই-রেজ্যুলেশনের কোনো ইউটিউব ভিডিও চালান বা গেম খেলুন। যদি দেখেন চার্জ খুব দ্রুত (যেমন: ২ মিনিটেই ৫-৭%) কমে যাচ্ছে অথবা ফোন অস্বাভাবিক গরম হয়ে যাচ্ছে, তবে ধরে নিতে পারেন ব্যাটারিতে সমস্যা আছে বা হেলথ বুস্ট করা হয়েছে।

৫. ফেস আইডি (Face ID) এবং ক্যামেরা টেস্ট

ফেস আইডি আইফোনের বেশ স্পর্শকাতর একটা অংশ। ফোন হাত থেকে পড়লে বা ডিসপ্লে পরিবর্তন করলে অনেক সময়ই ফেস আইডি নষ্ট হয়ে যায়। তাই কেনার আগে অবশ্যই নিজের মুখমণ্ডল স্ক্যান করে ফেস আইডি সেটআপ করবেন এবং লক-আনলক করে দেখবেন।

এরপর ক্যামেরা অ্যাপ ওপেন করুন। পেছনের প্রতিটি লেন্স (যেমন- আল্ট্রাওয়াইড, ওয়াইড, টেলিফটো) জুম ইন ও জুম আউট করে চেক করুন। পোর্ট্রেট মোড (Portrait Mode) চালু করে দেখুন পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ড ঠিকমতো ব্লার (Blur) হচ্ছে কি না। সামনের সেলফি ক্যামেরাতেও একই বিষয়গুলো যাচাই করে নেবেন।

৬. ওয়াটার ড্যামেজ ইন্ডিকেটর (Water Damage) চেক

বিক্রেতা হয়তো বলবে ফোনটি কখনোই পানিতে পড়েনি। কিন্তু তার কথায় বিশ্বাস না করে নিজেই চেক করে নিন। আইফোনের সিম ট্রে-টি খুলুন এবং ভেতরে ভালোভাবে আলো ফেলে দেখুন। সেখানে একটি ছোট্ট স্টিকার থাকে। যদি স্টিকারের রঙ সাদা বা রূপালি হয়, তবে ফোনটি নিরাপদ। কিন্তু স্টিকারটি যদি লাল রঙের হয়ে যায়, তবে ১০০% নিশ্চিত থাকবেন যে ফোনটির ভেতরে পানি ঢুকেছিল এবং এটি কেনা মোটেও উচিত হবে না।

৭. 3uTools দিয়ে কম্পিউটারে অ্যাডভান্সড চেকিং

ওপরের সবগুলো বিষয় চেক করার পরও যদি মনের ভেতর খুঁতখুঁত করে, তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো '3uTools'। ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে 3uTools নামের ফ্রি সফটওয়্যারটি ইনস্টল করুন এবং ডেটা ক্যাবল দিয়ে আইফোনটি কানেক্ট করুন। সফটওয়্যারটি ফোনের মাদারবোর্ড স্ক্যান করে একটি 'Verification Report' দেবে। সেখানে যদি সবকিছুর পাশে সবুজ রঙের 'Normal' লেখা থাকে, তবে বুঝবেন ফোনের কোনো যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হয়নি। আর যদি লাল রঙের 'May be changed' লেখা থাকে, তবে বুঝবেন ওই পার্টসটি (যেমন- ক্যামেরা বা ব্যাটারি) আগে পরিবর্তন করা হয়েছে।

৮. কোথা থেকে কিনবেন: দোকান নাকি অনলাইন মার্কেটপ্লেস

ফেসবুক মার্কেটপ্লেস বা বিভিন্ন গ্রুপ থেকে সরাসরি কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে ফোন কেনার চেয়ে পরিচিত মোবাইল শপ বা রিসেলার থেকে কেনাটা তুলনামূলক নিরাপদ। কারণ দোকানদাররা সাধারণত ফোনের একটা নূন্যতম ওয়ারেন্টি বা এক্সচেঞ্জ সুবিধা দিয়ে থাকে, যা পরে কোনো সমস্যা হলে কাজে লাগবে। তবে পরিচিত কারো মাধ্যমে বা সরাসরি কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে কিনতে হলে, অবশ্যই তার সাথে সরাসরি দেখা করে ফোন হাতে নিয়ে চেক করুন। কখনোই আগে থেকে টাকা পাঠিয়ে ফোন কিনবেন না। সম্ভব হলে এমন জায়গায় দেখা করুন যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, বা সাথে পরিচিত কাউকে নিয়ে যান।

৯. দরদাম এবং সঠিক বাজারদর যাচাই করার উপায়

ফোন কেনার আগে অনলাইনে একই মডেলের, একই স্টোরেজের এবং কাছাকাছি কন্ডিশনের আরও কয়েকটি বিজ্ঞাপন দেখে নিন, তাহলে বাজারদর সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা পাবেন। ব্যাটারি হেলথ কম থাকলে, স্ক্রিনে দাগ থাকলে বা কোনো পার্টস আগে পরিবর্তন করা থাকলে, সেই হিসাব করেই দরদাম করুন। মনে রাখবেন, বাজারদরের চেয়ে অস্বাভাবিক কম দামে কোনো ফোন পাওয়া গেলে সেটা নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকা উচিত, কারণ চুরি করা বা সমস্যাযুক্ত ফোন প্রায়ই অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি করার চেষ্টা করা হয়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

সেকেন্ড-হ্যান্ড আইফোনের ব্যাটারি হেলথ কত হওয়া ভালো?

সাধারণত ৮৫% থেকে ১০০% এর মধ্যে থাকা ব্যাটারি হেলথ ভালো সার্ভিস দেয়। তবে ৮০% এর নিচে নেমে গেলে ব্যাটারি খুব দ্রুত ড্রেন হতে পারে এবং তখন ব্যাটারি রিপ্লেস করার প্রয়োজন হয়।

Refurbished বা রিনিউড আইফোন কী? এগুলো কি কেনা উচিত?

Refurbished আইফোন হলো এমন ফোন, যাতে আগে কোনো সমস্যা ছিল, কিন্তু অ্যাপল বা অন্য কোনো ভেরিফায়েড কোম্পানি তা সারিয়ে নতুনের মতো করে বাজারে ছেড়েছে। এগুলো সাধারণত নিরাপদ হয়, তবে সেকেন্ড-হ্যান্ড মার্কেট থেকে কেনার আগে অবশ্যই 3uTools দিয়ে চেক করে নেওয়া ভালো।

কান্ট্রি লক (Country Lock) আইফোন কেনা কি ঠিক হবে?

না, একদমই ঠিক হবে না। কান্ট্রি লক করা আইফোনে আপনি চাইলেই যেকোনো সিম ব্যবহার করতে পারবেন না। এর জন্য আলাদা টার্বো সিম ব্যবহার করতে হয়, যা চরম বিরক্তিকর এবং নেটওয়ার্ক খুব আনস্টেবল থাকে। সর্বদা 'Factory Unlocked' ফোন কেনার চেষ্টা করবেন।

শেষ কথা

একটি সেকেন্ড-হ্যান্ড আইফোন কেনা কিছুটা লটারির মতোই। তবে আপনি যদি তাড়াহুড়ো না করে উপরের প্রতিটি পয়েন্ট সময় নিয়ে চেক করেন, তবে ঠকার সম্ভাবনা একেবারেই থাকবে না। ফোনটি কেনার সময় অবশ্যই বিক্রেতার কাছ থেকে অরিজিনাল বক্স, মানি রিসিট অথবা বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) একটি ফটোকপি নেওয়ার চেষ্টা করবেন, যাতে পরবর্তীতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আইনি ঝামেলায় পড়তে না হয়।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url