চুল পড়া বন্ধ করার ঘরোয়া উপায়

গোসল সেরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতেই চিরুনিতে জমে যায় এক গোছা চুল। দামী শ্যাম্পু-সিরাম ট্রাই করেও ফল যেন সেভাবে চোখে পড়ে না।

চুল পড়া বন্ধ করতে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক উপকরণ যেমন নারকেল তেল, পেঁয়াজ, অ্যালোভেরা সাজানো

অথচ ঠাকুরমা-দাদিমার আমলে এত রকম প্রোডাক্ট ছাড়াই মানুষের চুল থাকত ঘন আর চকচকে - রহস্যটা লুকিয়ে ছিল রান্নাঘরের সাধারণ কিছু উপকরণেই। এই লেখায় এমন কিছু ঘরোয়া উপায় নিয়ে কথা হবে, যেগুলো সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, খরচও কম, আর নিয়মিত করলে চুলের পরিবর্তনটাও বাস্তবে চোখে পড়ে।

কেন চুল পড়ে বা রুক্ষ হয়ে যায়

চুল পড়ার পেছনে একটা নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন, কারণ এর সাথে বেশ কয়েকটা জিনিস জড়িত থাকে। দূষণ, মানসিক চাপ, ঘুমের অনিয়ম, খাবারে পুষ্টির ঘাটতি, ঘন ঘন হিট স্টাইলিং, আর কড়া কেমিক্যালযুক্ত শ্যাম্পু-কন্ডিশনার ব্যবহার - এই সবকিছু মিলিয়েই চুল ধীরে ধীরে দুর্বল আর রুক্ষ হয়ে পড়ে। শহরের পানিতে ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকলে (হার্ড ওয়াটার) সেটাও চুলের রুক্ষতার একটা কারণ হতে পারে, যদিও এটা প্রায়ই আমরা খেয়ালই করি না। ভালো খবর হলো, জীবনযাত্রায় ছোট কিছু পরিবর্তন আর নিয়মিত যত্ন নিলে এই সমস্যাগুলো অনেকটাই সামলে নেওয়া যায়।

চুলের যত্নে কার্যকর কিছু ঘরোয়া উপায়

১. নারকেল তেল আর কারিপাতা

কড়াইয়ে নারকেল তেল একটু গরম করে তাতে কয়েকটা কারিপাতা দিয়ে ফুটিয়ে নিন, যতক্ষণ না পাতাগুলো কালচে হয়ে আসে। তেলটা ঠান্ডা হলে ছেঁকে নিয়ে মাথার তালুতে হালকা হাতে মালিশ করুন। কারিপাতায় থাকা পুষ্টিগুণ চুলের গোড়া মজবুত করতে সাহায্য করে।

২. পেঁয়াজের রস

একটা পেঁয়াজ বেটে বা ব্লেন্ড করে রস বের করে নিন। সেই রস তুলার সাহায্যে স্ক্যাল্পে লাগিয়ে ৩০-৪০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করে ফেলুন। গন্ধটা কিছুটা কড়া লাগলেও, চুলের গোড়া মজবুত করতে এই পদ্ধতি বহু পুরনো আর বহুল ব্যবহৃত।

৩. মেথি বাটা প্যাক

রাতে মেথি ভিজিয়ে রেখে সকালে বেটে নিন। এই পেস্ট পুরো স্ক্যাল্প আর চুলে লাগিয়ে ৩০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। মেথিতে থাকা প্রোটিন আর নিকোটিনিক অ্যাসিড চুল পড়া কমাতে আর নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে বলে অনেকেই মনে করেন। চাইলে এই পেস্টের সাথে সামান্য টক দই মিশিয়ে নিলে লাগাতে আরও সহজ হয় এবং চুলে একটা বাড়তি মসৃণ ভাবও আসে।

হাত দিয়ে স্ক্যাল্পে প্রাকৃতিক তেল মালিশ করা হচ্ছে

৪. ডিম আর টক দইয়ের প্যাক

একটা ডিমের সাথে দুই টেবিল চামচ টক দই মিশিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। পুরো চুলে লাগিয়ে ২৫-৩০ মিনিট রেখে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাক চুলকে ভেতর থেকে পুষ্টি জোগায় আর নরম-মসৃণ করে তোলে।

৫. অ্যালোভেরা জেল

তাজা অ্যালোভেরা পাতা থেকে জেল বের করে সরাসরি স্ক্যাল্পে লাগান। এটা স্ক্যাল্পের চুলকানি বা জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করে, সাথে চুলে একটা প্রাকৃতিক ঔজ্জ্বল্যও নিয়ে আসে।

৬. চালধোয়া পানি (রাইস ওয়াটার)

চাল ধোয়ার প্রথম পানিটা ফেলে না দিয়ে একটা পাত্রে সংরক্ষণ করুন, ১-২ দিন হালকা টক গন্ধ হওয়া পর্যন্ত ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিন। শ্যাম্পু করার পর শেষ ধাপে এই পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ৫ মিনিট রেখে সাধারণ পানিতে ধুয়ে ফেলুন। এশিয়ার অনেক দেশেই এই পদ্ধতি বহু পুরনো, চুলকে মসৃণ আর ঝলমলে করতে সাহায্য করে বলে অনেকে মনে করেন।

চুলে প্রাকৃতিক হেয়ার প্যাক লাগানো হচ্ছে হাত দিয়ে

খুশকি দূর করার ঘরোয়া উপায়

খুশকির সমস্যায় লেবুর রস আর নারকেল তেল মিশিয়ে স্ক্যাল্পে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলা যেতে পারে। নিমপাতা ফুটিয়ে সেই পানি দিয়ে শেষবার চুল ধুয়ে নিলেও উপকার পাওয়া যায়। সপ্তাহে একবার অ্যাপল সাইডার ভিনেগার আর পানি মিশিয়ে স্ক্যাল্পে ব্যবহার করলে স্ক্যাল্পের পিএইচ ব্যালেন্স ঠিক থাকে, যা খুশকি কমাতে সহায়ক। জেদি খুশকির জন্য মেথি বাটা আর টক দই মিশিয়ে একটা প্যাক বানিয়ে স্ক্যাল্পে লাগিয়ে ৩০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেললেও ভালো ফল পাওয়া যায়, কারণ এই মিশ্রণ স্ক্যাল্পের শুষ্কতা কমিয়ে খুশকি হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

চুল পড়া কমাতে দৈনন্দিন যা মেনে চলা উচিত

  • ভেজা চুল শক্ত করে বাঁধা বা জোরে টাওয়েল দিয়ে ঘষে মোছা থেকে বিরত থাকুন।
  • চুল আঁচড়াতে চওড়া দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন, সরু দাঁতের চিরুনি চুল বেশি ছিঁড়ে ফেলে।
  • খাবারে প্রোটিন, আয়রন আর ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার - ডিম, শাকসবজি, ডাল, বাদাম রাখার চেষ্টা করুন।
  • খুব গরম পানি দিয়ে চুল ধোয়া এড়িয়ে চলুন, এতে স্ক্যাল্প শুকিয়ে যায়।
  • সপ্তাহে অন্তত একবার তেল মালিশ করার অভ্যাস রাখুন।
  • ভেজা চুল সাথে সাথে আঁচড়াতে যাবেন না, প্রথমে হালকা তোয়ালে দিয়ে বাড়তি পানি শুষে নিয়ে তারপর আঁচড়ান।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখুন, কারণ শরীরের সামগ্রিক অবস্থার প্রভাব চুলের উপরও পড়ে।

চুলের যত্নে খাদ্যাভ্যাসে যা রাখা যেতে পারে

শুধু বাইরে থেকে তেল-প্যাক লাগালেই হয় না, চুল ভেতর থেকে পুষ্টি পেলে তবেই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল পাওয়া যায়। ডিম, মাছ আর ডাল থেকে প্রোটিন; পালং শাক, বিটরুট আর কলিজা থেকে আয়রন; বাদাম আর বীজজাতীয় খাবার থেকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং বায়োটিন - এই উপাদানগুলো নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে চুলের গোড়া ভেতর থেকে মজবুত হয়। বাইরের প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার কম খাওয়ার চেষ্টা করাও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।

কাঠের চওড়া দাঁতের চিরুনি দিয়ে সুস্থ চুল আঁচড়ানো হচ্ছে

যেসব ভুল সাধারণত হয়ে থাকে

অনেকেই একদিন হেয়ার প্যাক লাগিয়ে বা তেল মালিশ করে পরের দিনই ফলাফল আশা করেন, কিন্তু চুলের যত্ন আসলে ধৈর্যের কাজ - নিয়মিত করলে তবেই পার্থক্য বোঝা যায়। এছাড়া বারবার চুলে রঙ করা, স্ট্রেইটনার-কার্লার ব্যবহার করা আর একসাথে অনেকগুলো কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট চালিয়ে যাওয়াও চুলের ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়। অনেকে আবার একসাথে চার-পাঁচটা ঘরোয়া উপায় একই সপ্তাহে ট্রাই করে ফেলেন, যাতে বোঝা কঠিন হয়ে যায় আসলে কোনটাতে ফল হচ্ছে। একবারে একটা বা দুটো পদ্ধতিতে মনোযোগ দেওয়াই বেশি কার্যকর। ঘরোয়া উপায়গুলোর সাথে সাথে চুলের উপর অতিরিক্ত অত্যাচার কমানোটাও সমান জরুরি।

পেছন থেকে দেখা লম্বা, ঝলমলে, সুস্থ চুল

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

সপ্তাহে কতবার তেল মালিশ করা উচিত?

সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার হালকা হাতে তেল মালিশ করা যথেষ্ট। এর বেশি করলেও বাড়তি কোনো উপকার হয় না, বরং স্ক্যাল্প বেশি তেলতেলে হয়ে যেতে পারে।

হেয়ার প্যাক কতদিন পরপর ব্যবহার করা যায়?

সাধারণত সপ্তাহে একবার হেয়ার প্যাক ব্যবহার করাই যথেষ্ট। চুলের ধরন অনুযায়ী এটা কমবেশি করা যেতে পারে।

ঘরোয়া উপায়ে চুল পড়া বন্ধ হতে কতদিন লাগে?

এটা ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়, তবে নিয়মিত যত্ন নিলে সাধারণত ৪-৬ সপ্তাহের মধ্যে পরিবর্তন চোখে পড়তে শুরু করে।

পেঁয়াজের রসের কড়া গন্ধ কীভাবে কমানো যায়?

পেঁয়াজের রসের সাথে সামান্য লেবুর রস বা কয়েক ফোঁটা এসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে নিলে গন্ধ অনেকটাই কম লাগে।

হেয়ার প্যাক লাগানোর আগে কি প্যাচ টেস্ট দরকার?

হ্যাঁ, নতুন কোনো উপকরণ প্রথমবার ব্যবহারের আগে হাতের কনুইয়ের ভাঁজে সামান্য লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টা রেখে দেখে নেওয়া ভালো। জ্বালাপোড়া বা র‍্যাশ না হলে তবেই স্ক্যাল্পে ব্যবহার করা নিরাপদ, বিশেষ করে যাদের ত্বক সংবেদনশীল তাদের জন্য এই ধাপটা এড়িয়ে যাওয়া উচিত না।

চুলের যত্ন আসলে একদিনের কাজ না, এটা একটা অভ্যাস। রান্নাঘরের এই সাধারণ উপকরণগুলো নিয়মিত ব্যবহার করলে বাইরের কোনো দামী প্রোডাক্ট ছাড়াই চুল হয়ে উঠতে পারে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ আর ঝলমলে। শুরুতে হয়তো দুই-একটা পদ্ধতি বেছে নিয়ে ট্রাই করুন, তারপর যেটাতে চুল সবচেয়ে ভালো সাড়া দেয় সেটাই ধীরে ধীরে নিয়মিত রুটিনে যোগ করে নিন।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url